খালি পায়ে শুরু, ৪৩ বছরেও চলছে নাজিমের ফুটবলযাত্রা

0
11

খালি পায়ে ক্ষ্যাপ খেলা থেকে হাজার গোলের গল্প, নিজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও গড়ে তুলেছেন জাতীয় দলের ফুটবলার। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার মনোহরা গ্রামের নাজিম উদ্দিনের বয়স এখন ৪৩। এই বয়সে অনেকে ফুটবল থেকে দূরে থাকেন। কেউ হয়তো মাঠে আসেন দর্শক হয়ে। কিন্তু নাজিম এখনো নিয়মিত মাঠে নামেন। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলেন, গোল করেন, সতীর্থদের নিয়ে অনুশীলন করেন।

ফুটবল তার কাছে শুধু একটি খেলা নয়। এটি তার জীবনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী।

নাজিমের ফুটবলের শুরু অবশ্য বুট পরে নয়, খালি পায়ে। গ্রামের মাঠে স্থানীয়ভাবে আয়োজিত ‘ক্ষ্যাপ’ খেলায় বড়দের সঙ্গে খেলতেন ছোট্ট নাজিম। ৫২ কিংবা ৫৬ ইঞ্চির মাঠে বয়সে বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতেন।

দুই দলে ভাগ হওয়ার সময় ২২ জোড়া বুট থাকলে হয়তো তার জায়গা হতো না। কিন্তু খেলার সময় কাউকে বদলি করতে হলে নাজিমকে মাঠে নামানো হতো। কারণ, তাকে ছাড়া দল যেন পূর্ণ হতো না।

সেই খালি পায়ের ছেলেটিই একসময় গ্রামের মাঠ পেরিয়ে উল্লাপাড়ার মাঠে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। মনোহরা গ্রাম থেকে উল্লাপাড়া আকবর আলী কলেজের মাঠ প্রায় সাত-আট কিলোমিটার দূরে। ভোরেই সেখানে চলে যেতেন তিনি।

সেই মাঠে তখন সেনাবাহিনীর অনেক ভালো ফুটবলার অনুশীলন করতেন। লিটন ভাই, খোকনদা, রঞ্জুসহ বড়দের সঙ্গে অনুশীলন করতে করতেই ফুটবলকে জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলেন নাজিম।

১৯৯৯ সালে প্রথম বুট পায়ে ওঠে তার। দুই বছর পর, বয়স তখন ১২-১৩ বছর, সিরাজগঞ্জের প্রথম বিভাগের দল একক সংঘ ক্লাবে সুযোগ পান। খুব বেশি খেলার সুযোগ না পেলেও নিজের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পান।

এরপর বিকেএসপির ট্রায়ালে অংশ নেন। সেখানে ভালো করেন এবং চূড়ান্তভাবে ভর্তি হওয়ার সুযোগও পান। কিন্তু পরিবারের দায়িত্বের কারণে সেই সুযোগ আর নেওয়া হয়নি।

পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় তখন অনেক দায়িত্ব ছিল নাজিমের ওপর। তাই বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্নটা বাদ দিতে হয়। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন অবশ্য বাদ দেননি।

ঢাকার ফুটবলেও একসময় পা রাখেন নাজিম। পাইওনিয়ার ফুটবল থেকে তৃতীয় বিভাগ, ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন। তার খেলা নজরে আসে কোচ ও ফুটবল সংশ্লিষ্টদের। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও একই মাঠে খেলেছেন, লড়াই করেছেন।

জাতীয় দলের খুব কাছাকাছিও গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দরজা তার জন্য খোলেনি।

এই না-পাওয়ার কষ্ট অবশ্য নাজিমকে ফুটবল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং নিজের যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, সেটাই অন্য একজনের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা হিসেবে নিয়েছেন।

নিজের স্বপ্ন অন্যের পায়ে

গ্রামের তরুণদের নিয়ে নাজিম নিয়মিত অনুশীলন করাতেন। কোনো বড় একাডেমি ছিল না। ছিল না বড় কোনো আর্থিক সুবিধাও। নিজের অভিজ্ঞতা আর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ছেলেদের খেলাতেন।

সেখানেই তার নজরে আসে আব্দুল্লাহ পারভেজ।

নাজিম বলেন, ‘আব্দুল্লাহ দিনের পর দিন আমার পেছনে সময় দিত। বিকেল হলেই বলত, কাজ বাদ দেন, এখন খেলতে চলেন।’

ছেলেটির আগ্রহ দেখে নাজিম বুঝতে পারেন, তার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। একসময় আব্দুল্লাহকে ঢাকার তৃতীয় বিভাগ ফুটবলে খেলার সুযোগ করে দেন।

ঢাকায় যাওয়ার সময় তাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ফিরে এসেছিলেন নাজিম। কিন্তু এরপর থেকেই চিন্তা শুরু হয়। এত বড় শহরে একা ছেলেটি কীভাবে থাকবে? কেমন খেলছে? ঠিকমতো খেতে পারছে কি না?

দূরে থেকেও যোগাযোগ রাখতেন। ঢাকার পরিচিতদের ফোন করে আব্দুল্লাহর খোঁজ নিতেন। তার খেলার খবর নিতেন নিয়মিত।

সেই আব্দুল্লাহ পারভেজই পরে তৃতীয় বিভাগ থেকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ পান। আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের হয়ে এক মৌসুমে সাত গোল করে আলোচনায় আসেন। পরে জাতীয় দলের দরজাও খুলে যায় তার সামনে।

নাজিম নিজে জাতীয় দলে খেলতে পারেননি। কিন্তু তার হাতে তৈরি একজন খেলোয়াড় জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের জায়গায় এটাকেই বড় অর্জন মনে করেন তিনি।

হাজার গোলের গল্প

মাঝমাঠে আক্রমণভাগে খেলেন নাজিম। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তার গোলের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানান তিনি। বয়স বাড়লেও মাঠে তার গতি, বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণ তৈরির দক্ষতা এখনো কমেনি।

৪৩ বছর বয়সেও ফিট থাকার রহস্য কী?

নাজিমের উত্তর খুব সাধারণ। নিয়মিত অনুশীলন, সময়মতো খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম।

দিনের কাজ শেষ করে রাত সাড়ে ৯টা বা ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে ওঠেন। আবার মাঠে যান। ক্ষ্যাপ খেলা শেষ করেও নিয়ম মেনে বিশ্রাম নেন।

বছরের পর বছর একই রুটিন ধরে রেখেছেন তিনি।

তার কাছে ফুটবল কোনো বাড়তি কাজ নয়। বরং প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ।

মাঠ বদলেছে, নাজিম বদলাননি

একসময় খালি পায়ে গ্রামের মাঠে খেলেছেন। পরে বুট পায়ে উঠেছে। ৫২-৫৬ ইঞ্চির ক্ষ্যাপ খেলা থেকে ঢাকার প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল, অনেক পথ পেরিয়েছেন নাজিম।

সময় বদলেছে। ফুটবলের ধরন বদলেছে। মাঠের দর্শক বদলেছে। এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এসেছে নতুন প্রজন্মের ফুটবলার।

শুধু বদলায়নি নাজিমের ফুটবলপ্রেম।

৪৩ বছর বয়সেও তিনি মাঠে নামেন। এখনো গোল করেন। নতুনদের সঙ্গে খেলেন। তাদের শেখান। আর নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের গল্পও হয়তো খুঁজে পান তাদের পায়ের ছন্দে।

একসময় যে ছেলেটির হাতে বুট ছিল না, সেই নাজিম আজও ফুটবল হাতে মাঠে ছুটছেন। তার নিজের স্বপ্ন হয়তো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। কিন্তু অন্যের স্বপ্ন পূরণে যে ভূমিকা রেখেছেন, সেটাই এখন তার সবচেয়ে বড় জয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here